বেঞ্চ নির্ধারণে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি

0
28

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ১৮ বছর আগের এই দিনে মুহুর্মুহু গ্রেনেডের বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। মানুষের আর্তনাদ আর ছোটাছুটিতে সৃষ্টি হয় এক বিভীষিকা। গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ওই হামলায় মারা যান আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকশ’ নেতাকর্মী। এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া দুই মামলার বিচার হয়েছে অধস্তন আদালতে। রায়ে ৪৯ আসামির মধ্যে হত্যা মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসি, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। এসব আসামির মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসি এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এখন শুনানির অপেক্ষায়। পেপারবুকসহ যাবতীয় নথি প্রস্তুত। প্রধান বিচারপতি একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিলেই হাইকোর্টে শুনানি শুরু হবে।

জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা রাষ্ট্রীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মামলা। নজিরবিহীন ওই হামলার মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থবির ও ধ্বংসের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সে কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা মামলাটি শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর দরখাস্ত করেছি। প্রধান বিচারপতি মামলাটি শুনানির জন্য একটি বেঞ্চ ঠিক করে দেবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আশা করছি সেপ্টেম্বরে অবকাশ শেষে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানি হাইকোর্টে শুরু হবে। মামলায় বিচারিক আদালতে আসামিদের যে সাজা হয়েছে তা বহাল রাখতে হাইকোর্ট শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আইনগত দিক তুলে ধরবে।

advertisement
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের দিনটি ছিল শনিবার। সেদিন বিকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আয়োজন করা হয় সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ। যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। হাজার হাজার মানুষের সমাগম ছিল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের চতুর্দিকে। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী একটি মিছিল হওয়ার কথা। তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জে চেপে বিকাল ৫টার একটু আগে সমাবেশস্থলে পৌঁছান শেখ হাসিনা। সমাবেশে অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তৃতার পর শেখ হাসিনা বক্তব্য দিতে শুরু করেন।

ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন বিকাল ৫টা ২২ মিনিট। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে শেখ হাসিনার বক্তৃতা শেষের মুহূর্তেই শুরু হলো ভয়াবহ নারকীয় গ্রেনেড হামলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে লাগল একের পর এক যুদ্ধে ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড। আর প্রাণবন্ত বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে। শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় ঘাতকরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্রেনেড হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশস্থল। এ ঘটনায় করা মামলায় পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল হয়। একটি হত্যা এবং অন্যটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এর পর বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১।

বিচারিক আদালতের রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন দুই শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদ- দেন বিচারিক আদালত। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১৪ জন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) সদস্য। এ ছাড়া রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং অপর ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-সহ অর্থদ- দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জন : বিচারিক আদালতের রায়ে ১৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অব) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আবদুর রহিম (সম্প্রতি মারা গেছেন), হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ, জঙ্গিনেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু সাইদ, মুফতি মঈনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, হাফেজ আবু তাহের, মো. ইউসুফ ভাট ওরফে মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক, মফিজুর রহমান ওরফে মহিবুল্লাহ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হোসাইন আহমেদ তামিম, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ও মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১৯ জন : বিচারিক আদালতের রায়ে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদ- দেওয়া হয়। তারা হলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও আরিফুল ইসলাম আরিফ, জঙ্গিনেতা মুফতি আবদুর রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মুরসালিন, মুত্তাকিন, জাহাঙ্গীর বদর, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. ইকবাল, রাতুল আহমেদ, মাওলানা লিটন, মো. খলিল ও শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল।

বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত দণ্ডিত ১১ জন হলেন- মেজর জেনারেল (অব) এটিএম আমীন, লে. কর্নেল (অব) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, লে. কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, ডিএমপির সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, জোট সরকার আমলের তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও সাবেক পুলিশ সুপার রুহুল আমীন।

রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে কারাগারে থাকা দ-িত ব্যক্তিরা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দুই মামলায় জেল আপিল করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত আপিলও করেছেন দণ্ডিত। এ অবস্থায় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন পেপারবুক প্রস্তুত করতে সরকারি ছাপাখানায় (বিজি প্রেসে) পাঠায়। মামলার পেপারবুক তৈরির পর বিজি প্রেস ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট তা হাইকোর্টে পাঠায়। দুটি মামলায় প্রায় ২২ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক। এখন এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত। প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ নির্ধারণ করলেই হাইকোর্টে এ মামলার বিচার শুরু হবে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here