ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরও নাগালে আসেনি পেঁয়াজের দাম। রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। আর ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে দেশের বাজারে পৌঁছাতে হাত বদলে পণ্যটির দাম পাঁচগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। বাড়তি দামের জন্য একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন ব্যবসায়ীয়রা। মাঝখান দিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করে নিচ্ছে সিন্ডিকেট চক্র।
সরকারের অনুমতি পাওয়ার পর গত ৫ জুন ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ৫ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ১০ দিনে ৫৯ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে এনেছেন ১৪৬ ব্যবসায়ী। আমদানির তথ্য খতিয়ে দেখা গেছে, ভারতের ইন্দোর, মহারাষ্ট্র ও নাসিক অঞ্চল থেকে পেঁয়াজ ভারতের বালুরঘাটে জড়ো হয়। সেখানে মানভেদে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭ থেকে ৯ রুপি। টাকার হিসাবে দাম পড়ে ৯ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ প্রায় ১০ টাকায় কেনা পেঁয়াজ দেশের বাজারে খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়।
কেনা দামের সঙ্গে আমদানি শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক যুক্ত করলে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, সাতক্ষীরার ভোমরা ও দিনাজপুরের হিলি, বেনাপোল, বুড়িমারী, সোনাহাট, বাংলাবান্ধা, শেওলা, বিবিরবাজার ও আখাউড়া এলাকায় পেঁয়াজের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। এর পরও খুচরা বাজারে পৌঁছাতে আরও ৩২ টাকা দাম বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তদার ও কমিশন এজেন্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতীয় পেঁয়াজ তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকে মানভেদে ১৮ থেকে ২০ টাকায় কিনছেন। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যুক্ত করে প্রতিকেজি দাম পড়ে ২২ থেকে ২৫ টাকা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এই তথ্য আর খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারের চিত্র মিলছে না।
গতকাল দুপুরে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখা গেছে। গত ৫ জুন এই একই পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ থেকে ধারণা করা যায়, হাত বদলে অতিরিক্ত মুনাফা করছে সিন্ডিকেট চক্র।
খাতুনগঞ্জে হামিদুল্লা মিঞা মার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমরা আমদানিকারক থেকে কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা কমিশনের ভিত্তিতে পণ্যটি সংগ্রহ করে বিক্রি করি। ওটাই আমাদের লাভ।’ একই কথা জানান রাজধানীতে পেঁয়াজের বৃহত্তম পাইকারি বাজার শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরাও। এখানকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, গতকাল রবিবার এ বাজারে পাইকারিতে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩১ টাকা পর্যন্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্যামবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাতে দাম নিয়ন্ত্রণ হয় না। সরবরাহকারীরাই দাম নিয়ন্ত্রণ করে। পেঁয়াজ ক্রয়ে পাকা রসিদও থাকে না।’
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাসেমও বলেন, আমদানিকারকরা একেক সময় একেক দামে পণ্যটি বিক্রি করেন। এর সঙ্গে পরিবহন আর শ্রমিক খরচ যুক্ত করে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। দাম যা বাড়ান আমদানিকারকরাই বাড়ান।
তবে হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক মনির হোসেন বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘এখন ভারতের নাসিক এলাকায় ট্রাকে বোঝাই করার পর পাঁচ দিনের মধ্যেই পেঁয়াজ দেশে চলে আসছে। ভারতে পেঁয়াজের টন ৭ হাজার রুপি। এক ট্রাক (১৪ টন) প্রায় ৯৮ হাজার রুপি। দেশীয় মুদ্রায় যা ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা পড়ে (প্রতি রুপি ১.৩০ পয়সা হিসেবে)। দেশে এ পেঁয়াজের কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি করছি।’
কারসাজি করেও বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজির প্রবণতা কমছে না বলে মনে করেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও অভিযান হয়েছে, সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের লম্বা তালিকাও হয়েছে। কিন্তু তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না।’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, এ বছর দেশীয় উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু মজুদ সুবিধার অভাবে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়।










