Home ফিচার লেখক চা-সমাচার

চা-সমাচার

এক কাপ চা । সে আর নতুন কী । কতোই তো খান । ঘরে –বাইরে, হাটে-বাজারে, ইষ্টিশনের রেস্তোরায় , গঞ্জের স্টলে । খেয়েছেন চা ওয়ালার ফ্লাস্কের চা । কাজের লোকের চা । পিচ্চির হাতের চা । লাল চা, কালো চা ,লিকার চা ,রং চা , দুধ চা । কষ্টি চা , তেতো চা ,লবণ চা । শ্রীমংগলের সাত রঙ চা । কতো স্বাদ লেবু আদার টক চা । আরও খেয়েছেন গিন্নির হাতের গরম চা । এলাচ দারুচিনি তেজপাতা চা । মজা করে খেয়েছেন গাভীর দুধের চা । গুড়ো দুধের গাঢ় চা । কনডেন্সড মিল্কের পেস্টি চা । মাল্টোভা গলা চকোলেট চা । চিনিমুক্ত চা ,জিরোক্যালের টেবলেট চা । রেডি টি’র অম্ল চা আর টি ব্যাগের গামলা চা –ও খেয়েছেন । কাঁচা গন্ধ ভরা ,আলগা পাতি মারা চা কতো মজা । মজা মজা করে আইস টি-ও খান —ঠোঁট ঠ্যাঙানো ঠান্ডা চা । মগজ ধোলাই করতে খান জিহ্বা পোড়া গরম চা । মাথা ধরা দূরের চা , ক্লান্তি দূরের শ্রান্তি চা । সর্দি-কাশির ওষুধ চা । জ্বর-ব্যাথা ছাড়ার চা । চায়ের কতো গুণ ।

নামি-দামী কতো ব্র্যান্ডের চা । ব্রুক বন্ড রেড লেবেল চা । ন্যাশনাল চা । কাজি চা । ফিনলে চা । নাম্বার ওয়ান চা । লিপটন তাজা চা । ইস্পাহানি মির্জাপূর চা । টেটলি চা । কেটলির চা , গ্লাসের চা , মগের চা ,মগের চা , জগের চা ।আরও কত কি ।

কৃতি চায়ের আছে কতো আকৃতি ,কতো আকার । মিহি চা । দানাদার চা । খোলা চা । পলি প্যাকের মিলি চা । বস্তা ভরা সস্তা চা । টি ব্যাগের প্যাকেট চা ।

রসনা তৃপ্তির কতো পথ । গরম- ঠাণ্ডা ,হালকা গরম, কুসুম গরম ,বেশি গরম আর আছে অতি গরম চরম চা । গালে লাগা চা । জিহবা পোড়া চা । ঘাম ঝরা চা । ফুড়ুত ফুড়ুত খাওয়ার চা , পিরিচ ঢালা চা ।

চায়ের কাপ । সে আর নতুন কী । কিন্তু একবার ভেবে দেখুন । তার কতো রঙ ,কত্তো বাহার । মডার্ণ ডিজাইন । গোল ,চেপ্টা ,চৌকোণা । কোমর চাপা কিংবা বুক ফোলা চায়ের কাপও দেখা যায় । বাঁকা হাতল ,চৌকো হাতল , ত্রিকোণী হাতল অথবা বৃত্ত হাতল । শুধু চারুকার নয় কারুকারের নিপূণ হাতের ছোয়া লেগেছে চায়ের কাপে ।ফুল , পাখি আর জল্পনা-কল্পনার কত সমাহার । ধাতু –অধাতু ,শক্ত- নরম , কঠিন- সোজা, স্বচ্ছ-গাঢ় কতো পদার্থ ,কতো জিনিসের তৈরি চায়ের কাপ । নারকেলের মালায় তৈরি কাপ । চকচকে চিনা মাটির চায়না কাপ, দেশীয় সিরামিকের লাইট কাপ, ভিতর-বাহির দেখা কাঁচের কাপ , প্লাস্টিকের ইলাস্টিক কাপ ,কাদা মাটির লাল পোড়া কাপ , টনটনে টিনের কাপ । ওয়ান টাইম ফ্লেক্সি কাপ । সিক্স পিসের ফিক্স কাপ । বড় কাপ ,ছোট কাপ । ঢাকনা লাগা কাপ । আর জওয়ান সেনাদের জন্য আছে বালতি ভরা চা ।

ঘুম থেকে ওঠে চা । সকালের চা । বিকালের চা । সন্ধ্যার চা ,রাতের চা । অনেকে আবার দুপু্রের চা খেয়ে অভ্যস্ত । টাইমের চা , বেটাইমের চা । এখন- কখন -যখন খুশি তখন চা । চায়ের যে কি গুণ যে খায় সেই জানে । পরম স্বাদের চরমামৃত চা ।

কাজের ফাকে চা । ফাইল ঘেষা অফিসের চা । চিন্তার মাঝে চা । অবসরে বসে চা । পড়ার টেবিলে চা । খবরের কাগজে চা । লেখালেখির ভেতর চা । আড্ডায় চা । দরবারে চা । সভায় চা । চেয়ারম্যানের চা ।চৌকিদারের চা । শিক্ষকের হাতে চা । ওয়াজ-মাহফিলের চা । বক্তার হাতে চা , শ্রোতার হাতে চা । সবখানে চা । সবার হাতে চা । চা –স্টলের চেচামেচি চা ।

বিস্কুট ভেজা চা । সিংগারা পুড়ির চা ।পরাটার পরে চা । নাস্তার শেষে চা । রাস্তার উপরে চা । লাঞ্চের ঘরে চা । মঞ্চের ভিতর চা ।লঞ্চে ভাসা কেবিন চা ।বাস স্টপের স্ট্যান্ডিং চা । ট্রেনের লেইট চা , প্লাটফরমের ফেরি চা । ওয়েটিং রুমে চা ,ঘুম ঘুম ভাঙ্গা চা । জার্নির ক্যারি চা ।

শীতে চা, গ্রীষ্মে চা ,বর্ষায় চা । উষ্ণ চায়ের কাপের তৃষ্ণ ধোয়া কাঁপুনি দেয়া শীতল বাতাসকে ঝাকুনি দেয় । ভাপসা গরমে চর্মে ঘর্ম ঝরায় ; প্রশান্তি দেয় । আষাঢ়-শ্রাবণে বিরামহীন বর্ষনে তাপশূন্য বায়ুমণ্ডলে ঘর্ষণ লাগায় এক কাপ চা । না- ভেজা ,না- শুকনো মনে আনে বসন্তের দোলা । চায়ের কাপের চুমুকে চুমুকে বহে বৈশাখী ঝড়ো হাওয়া । তাইতো মাস , ঋতু বছর আর দিন ক্ষণ,ঘণ্টা্র কোন ভেদ নেই চায়ের কাপে । বিশ্ব বিজয়ী চায়ের সবখানেই সমান কদর ।

সুখী -দুখী, আর্ত –পীড়িত , সুস্থ-সবল , ধনী –দরিদ্র , ফরসা -ময়লা , লম্বা-বেটে , ছোট-বড় আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা , মেয়ে কিংবা পুরুষ সর্বপাত্রে সমান প্রিয় এই কালো মনি চা । চায়ের উন্নত সংস্করণ কফি এখন আর শুধু উপর তলার লোকদের ঘরে নয় , নীচু তলার মেঝেতেও যায় আসে যায় ।

চীন থেকে এলো চা । বৃটিশ, ভারত শিখলো চা । চাটগাঁ ,সিলেট বানালো চা । পাক বাংলা খেলো চা । দাদা -বাবার হাত ভুলে তা আমার হাতে এলো চা । সঙ্গিনীও খেলো চা । বাচ্চারাও নিলো চা । এখন সবার হাতে চা । চিৎকার করে চা , চামচারা চায় চা ।

আদরে চা , সমাদরে চা । আপ্যায়নে চা । চাচার হাতের চা , চাচীও বানায় চা । ভাবীর দেয়া ভারী চা । আর ও মজা আড্ডা মারা চা । ইলেকশনের ফ্রি চা , রাজা মন্ত্রি বানায় চা । চাটুকারের চর্চা চা ।

আমার ঘরের চা । সে কি আর বলব । নীল আগুণে পোড়া লাল চা । মানেটা বুঝেন নি । এল পি গ্যাসের চুলা । তার উপর পাকা রাধুনি । চা তৈরির শেষপর্ব । তপ্ত জলে যেন কালো মেঘের সাঁতার কাটা । গরম জলে ভেজা জলীয় বাষ্প । বাকা নল বেয়ে বেরুনু গন্ধ । উনুন থেকে নামবে চা । আপনি তার কাছাকাছি । একবার ভেবে দেখুন । আপনার কি আর তর সয় ? এক কাপ চা এলো সমুখে । সকল জনমের ধকল কেটে এক সুবাসিত নির্যাস এলো । চায়ের পেয়ালা হাতে । মনে পড়ে যাবে শৈশব ,কৈশোরের দূরন্ত ছোটাছুটি । চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতেই ফিরে যাবেন পেছনে , যৌবনের উত্তাল তরঙ্গ মালায় হারিয়ে যাবে অতীত- বর্তমানের সকল গ্লানি । এক নতুন রূপে আবির্ভূত হবেন । সনাতনীদের মতো পূনর্জন্ম লাভ করিবেন । বিশ্বাস হয় না ? একবার খেয়ে দেখুন । মোহাম্মদ বিন কাশিমের মতো সিন্ধু বিজয় ও আপনার দ্বারা সম্ভব । ডুবে যাওয়া টাইটানিককে তোলা অসম্ভব হবে না । মহাকাশ গবেষণার জন্য নাসায় যেতে হবে না । আপনি ই হবেন মঙ্গলে পা রাখার প্রথম ব্যক্তি । খুঁজে পেতে পারেন সুপার আর্থ । হয়তো বা ডুবে যেতে পারেন ব্ল্যাক হোলে । এক রাতেই পদ্মা সেতু বানাতে পারবেন ।বোধ করি একাই কর্ণফুলি টানেলটা নির্মাণ করবেন । তাবৎ কালের সমস্ত জ্ঞানী ,গুণী ,পণ্ডিতদের লব্ধ বিদ্যা বুদ্ধি আপনার মগজে ঢুকে যাবে । আপনি হয়ে যাবেন বিশ্বখ্যাত মহাজন । বিশ্বাস যদি না হয় একবার খেয়ে দেখুন । আপনাকে দার্জিলিং যেতে হবে না । এককাপ চা । আমার ঘরের চা । সে এক অপূর্ব সৃষ্টি । কে এই চা স্রষ্টা ? আর কেউ নয় । আমারই ঘরের রাধুনি ,অর্ধাঙ্গিনী । চীন-তাইওয়ান কিংবা ভারত হয়ে নেপাল যেতে হবে না । এভারেস্ট বিজয়ের জন্য কাদি কাদি ডজন-কুড়ি ডিম খেতে হয় না । আদা লেবুর সাদা সিধে এক কাপ রঙ চা –ই যথেষ্ট ।

যুগে যুগে আয়ুর্বেদি শাস্ত্র , ডাক্তার-বৈদ্য আর হোমিওপ্যাথীর পাতায় পাতায় ঘুরেছে মানুষ । বয়স কমাতে , বয়স ধরে রাখতে খেয়েছে লতা-পাতা ,তৃণ ,ছাল-বাকর আর তিক্ত স্বাদের ফল মূল । খেয়েছে চিরতার রস । মৃত সঞ্জিবনী নামক টনিক নিয়ে হারানো সময়কে ফেরাতে চেয়েছে । কিন্তু পারেনি । পেরেছ কী ? যদি আমার ঘরের চা পেত তা হলেই হতো । এক কাপ চা ,শুধু এক কাপ চা- ই সকল অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে ।

দিন বদলেছে । যুগ পাল্টেছে । চা-ও থেমে নেই । ব্ল্যাক থেকে হোয়াইট টি । গ্রীন টি ।ক্যাফেইন লেস টি । ইন্সট্যান্ট ফ্লেভার চা । ভেনিলা চা । আরও আছে লবঙ্গ চা । কত্তো রকমের চা । যত্তো রকমের চা- ই থাকুক আমার ঘরের চা সে ভিন্ন কথা । একবার খেলে চায়ের সন্ধান দাতা চীন সম্রাটের দেখা পাবেন । গেরুয়া বসনে আর যোগাসনে চা । ন্যাড়া মাথায় ধ্যানমগ্ন হয়ে মৃত বৃক্ষে ফুল পাতা গজাতে পারবেন । আর কি চান ? চিনচিন করা মাথার চিন্তাকে চৌচির করতে এক কাপ চা-ই যথেষ্ট নয় কী ?

আমার ঘরের চা । রঙ , রূপ , রস , গন্ধে অতুলনীয়- একাকার হয়ে যাবেন আপনি । যা একবার খেলে ছন্দ-কাব্যের উঠা-নামার তাল-বেতালে বেসামাল হয়ে যাবেন । বনলতা সেন আপনার সামনে এসে হাজির হবে । জীবনানন্দ নিয়ে আসবে নতুন জীবন । রবিঠাকুরের রবির আলোতে জ্বলে উঠতে চান ? এক কাপ চা-ই আপনাকে নিয়ে যেতে পারে গ্রাম ছাড়া রাঙা মাটির পথে । ভিন দেশে ঘুরে আসতে পারেন মুজতবা আলীর সাথে । দুর্গম গিরি ,কান্তার মরু পেরুতে বিদ্রোহীর হিম্মত পাবেন । এক কথায় এক কাপ চা –ই পারে নিরস মনে রস যোগাতে । চরস খাইয়ে সরস করতে চান ? গরম জলে ধোয়া কাপে এক কাপ চা খান । মাত্র এক কাপ চা গত -বিগত ,আগত-অনাগত ,সমাগত সকলকে জানাতে পারে স্বাগত । স্বচ্ছ –অস্বচ্ছ , দেখা-অদেখা ,মন্দ-ভালো আর আঁধার-আলোর পার্থক্য বুঝতে তপ্ত চায়ের স্বাদ নিন । নাইট্রিকে যেমন সোনা যাচাই , চায়ে তেমন কাজটা যাচাই ।

ডান হাতের কাজ আর বা হাতের কাজ, সব কাজেই এক কাপ চা আসে খুব কাজে । অর্থ-অনর্থ ,স্বার্থ –পরার্থ সব খানেই চা খুব স্বার্থক । বেহুদা ক্ষুধামন্দা চায়ের ঘাড়ে চাপানো নিরর্থক । রাঙা চা শুধু চাঙ্গা-ই করে না অনেক কঠিন ব্যামো থেকে বাঁচায় । আপনার ই অত্যাচারে অন্ত্র-বৃক্ক ক্ষতিগ্রস্ত ,যার দায় চায়ের ই উপর দেয়ার ষড়যন্ত্র । যান্ত্রিক যুগের রন্দ্রে রন্দ্রে সকলেই মহাব্যস্ত । আসুন সকল তন্ত্র-মন্ত্র ভুলে , চপলতা ছেড়ে , চিরচেনা চায়ের সংগে চনমনে ভাব করি ।

কাজী মোঃ বশীর

প্রধান শিক্ষক,

খাপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,মুরাদনগর, কুমিল্লা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here