শোকাবহ অগাস্ট মাসে গোটা জাতি বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি, যার ফলে বাঙালি জাতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
জাতি হিসাবে ঠিক কতটা ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম আমরা সেই কাল রাতে, তা হয়তো পরিমাপ করা সম্ভব হবে না। তবে জাতির পিতার নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও সাহসী পদক্ষেপের কথা সম্পর্কে চিন্তা করলে আমরা অনুধাবন করতে পারবো কেন তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি সম্বোধন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কঠিন সময়ের এক পরীক্ষিত বন্ধু রাশিয়া। যুদ্ধের সময় যখন আমেরিকার মত পরাশক্তি প্রকাশ্যে আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তখন ভারত ও রাশিয়ার মত বন্ধুদের সহায়তায় ও সমর্থন পেয়েছি আমরা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশকে হেয় করার পরিকল্পনা ছিল আমেরিকার, যা বঙ্গবন্ধু সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ভি এফ পাপোভের সাথে এক কথোপকথনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, মার্কিন সরকারের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য মোটা অঙ্কের সাহায্যের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। মূলত রাজনৈতিক শর্তের শৃঙ্খলে আটকা পড়ার আশঙ্কায় তিনি মার্কিনদের সাহায্য গ্রহন করেননি। পাপোভকে বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, “আমি প্রয়োজনে আরও তিন থেকে পাঁচ বছর দুঃখ-কষ্ট সহ্য করব। কিন্তু কোনো ধরনের রাজনৈতিক শর্তসাপেক্ষ সাহায্য নেব না।” একটি উন্নত ও স্বাবলম্বী জাতি গঠনের জন্য তার প্রত্যয় এতোটাই দৃঢ় ছিল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর এক আধুনিক, স্বনির্ভর জাতি গড়ে তোলার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, তা আর কেউ দেখতে সক্ষম হয়নি। এমনকি সেই সময়ের উন্নত দেশগুলোও বাংলাদেশের মাঝে কোন আশার আলো দেখতে পাননি। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মত দক্ষতা ছিল বঙ্গবন্ধুর মাঝে, যার ফলে হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায় “তলাহীন ঝুড়ির দেশ” আজ পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছে, মহাশূন্যে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে নিজস্ব স্যাটেলাইট। স্বাধীনতার মাত্র ৪৭ বছরের মাঝে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্যিই বিস্ময়কর।
আজকের এই উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য। পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমানে আমরা যে সকল উন্নয়নের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি তা হয়তো আরো অনেক বছর আগেই অর্জন করা সম্ভব হতো যদি বঙ্গবন্ধু আরো দীর্ঘ সময় ধরে আমাদেরকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন।
চিন্তা করলে অবাক হতে হয় যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় কিভাবে বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যতের পৃথিবীকে কল্পনা করতে সক্ষম হতেন! এমন নাজুক সময়ে যখন অনেকেই ভেঙ্গে পরতেন এবং বিদেশি সাহায্যের জন্য তাকিয়ে থাকতেন, সেই সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার স্বনির্ভর এক জাতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ যেন ভারতের আর্থ স্টেশন বা উপগ্রহ ভূকেন্দ্র ব্যবহার করে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখে। তবে বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সাথে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নিজ দেশেই আর্থ স্টেশন তৈরির কাজ শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে রাঙ্গামাটিতে উদ্বোধন করেন দেশের প্রথম আর্থ স্টেশন বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র।











