কমে না কেন চালের দাম

0
183

যে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে, এটাই বাজার অর্থনীতির সূত্র। ফলে উৎপাদন ও বিপণনে একটা বাস্তবভিত্তিক যোগসূত্র বিদ্যমান। যে যোগসূত্রকে ঘিরে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন চালকে ঘিরে সময়ে অসময়ে কূটকৌশল, মজুদদারি, সিন্ডিকেট, এমনকি সরকারের ভ্রান্ত নীতিমালার বলি হচ্ছে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। বলতে গেলে ধান-চালের ভরা মৌসুম সদ্য বিদায় নিয়েছে। যে মুহূর্তে চালের বাজারদর ভোক্তার নাগালে থাকার কথা, সে মুহূর্তে পাগলা ঘোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সব ধরনের চালের দাম। কিন্তু কেন? এ বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতেই আজকে এ লেখার অবতারণা।

কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর উর্বর মাটিই আমাদের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অবলম্বন। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর আগে। যখন এ দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটির মতো। সে সময় মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বলতে তেমন কিছুই ছিল না। দিনে তিনবেলার জায়গায় একবেলা, আধাপেটা কিংবা উপোস করে জঠরজ্বালা নিয়ে ঘুমোতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাই ছিল অনেক বেশি। এমনকি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ছিল না। একমাত্র সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষে কৃষিতে অভাবনীয় সফলতার দরুন আজ খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়েছে। আজ দেশের জনসংখ্যা ৭ কোটির স্থলে প্রায় ১৭ কোটি। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, বসতবাড়ি, হাটবাজার, নগরায়ণে প্রতিবছরই এক শতাংশ করে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। তবুও বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়েছে। কারণ স্বাধীনতা-পূর্ব দেশে যেখানে পৌনে এক কোটি টন চাল উৎপাদন হতো, এখন সেখানে প্রায় ৪ কোটি টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। সেখানে চালের বাজার অস্থির থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকলেও শুধু সরকারের ভ্রান্ত খাদ্যনীতির কারণে দিনে দিনে চালের কহর দেখা দিয়েছে। বিষয়টি একটু পরিষ্কারভাবেই উপস্থাপন করা জরুরি।

এমন এক সময় ছিল, যখন কাঠের তৈরি ঢেঁকিই ছিল ধান থেকে চাল উৎপাদনের অন্যতম অবলম্বন। স্বাধীনতা-উত্তর ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ধান থেকে চাল তৈরিতে যান্ত্রিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এমনকি ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে গোটা দেশেই কমবেশি পাকা মিল চাতাল স্থাপন শুরু হতে থাকে। এক পর্যায়ে যা মহীরুহে রূপ নেয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে গোটা দেশে প্রায় ১৪-১৫ হাজার হাসকিং মিল চাতাল স্থাপিত হয়। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ও জনগণের আপৎকালীন খাদ্য মজুদের জন্য চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে চাল সংগ্রহ শুরু করে। ফলে উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে হাসকিং মিল চাতাল সমৃদ্ধ হতে থাকে। যেখানে লাখ লাখ নারী ও পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে শুরু করে। উল্লেখ্য, হাসকিং মিল চাতাল শিল্পে উৎপাদিত চালে একদিকে মানুষের খাদ্য চাহিদা যেমন পূরণ হতো, তেমনি সরকারের খাদ্য সংগ্রহ অভিযান সফলের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিশেষ অবদান রাখে। ফলে এক একটি হাসকিং মিল পরোক্ষভাবে সরকারের ধান ক্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিটি হাসকিং মিলে কৃষক খুব সহজে সরাসরি ধান বিক্রয় করে ভালো দামও পেতেন। যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো সুযোগ ছিল না। কৃষক সরাসরি হাটবাজারেও ধান বিক্রি করতে পারতেন। কারণ প্রতিটি হাসকিং মিলার পাশর্^বর্তী হাটবাজার, নদীর ঘাট থেকে ধান কিনে মিলে আনতেন। ধান কেনার ক্ষেত্রেও এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। যদি কোনো পণ্যের ক্রেতা বেশি থাকে, সে পণ্যের দামও বিক্রেতারা ভালো পাবেন, এটাই বাস্তবতা।

আজ কিন্তু সে অবস্থা আর নেই। সরকারের নতুন খাদ্যনীতির কারণে হাসকিং মিল চাতালের অতীত সে ঐতিহ্য বিলীন হয়ে গেছে। হাসকিং মিলের অ্যাঙ্গেল বার্গ পদ্ধতির ধান ছাঁটাইয়ের বদলে চীন ও কোরিয়ায় তৈরি হাসকার, পলিসার স্থাপন করে অটোমেটিক চালকলের আধিপত্য এখন সর্বত্রই। যেখানে চাল ছাঁটাই করলে ঘষেমেজে চাল চকচকে করা হয়। ফলে চালের উপরি ভাগের পুষ্টিযুক্ত আবরণও উঠে যায়। অনেকটা ‘চকচক’ করলে সোনা হয় না’ অবস্থার মতোই। চাল ঠিকই চকচক করে কিন্তু সে চালে কোনো পুষ্টিগুণ থাকে না। চালের উপরি ভাগের অংশকে বলা হয় ‘ব্রান’। যে ব্রান দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত উন্নত দামি ভোজ্যতেল তৈরি হয়। যে তেলের বাজার ভারতসহ উন্নত অনেক দেশেই এখন রমরমা। ফলে দেশে পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে বৃৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশে (আইসিডিআিরবি) যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি এবং ডেটা ফর ইমপ্যাকট যৌথভাবে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত প্রবন্ধে উঠে এসেছে, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি এক কোটি ৮০ লাখ বিবাহিত নারীর মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ নারীই অপুষ্টিতে ভুগছেন। অথচ দেশের মানুষের খাদ্য গ্রহণের সক্ষমতা বেড়েছে। সবজির আবাদ কয়েকগুণ বেড়ে এখন বিশে^ তৃতীয় অবস্থান দখল করেছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ নারী-শিশু অপুষ্টিতে ভোগার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতাকে তো আর অস্বীকার করার জো নেই। বাঙালির প্রধান খাদ্য হলো ভাত। সে ভাতের চালের উপরি ভাগের পুষ্টি যদি ধনী মানুষের ভোজ্যতেলের অবলম্বন হয়, তা হলে পুষ্টিহীনতা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

শুধু তাই নয়। পুষ্টিহীনতার পাশাপাশি চালের ভোক্তাদেরও বাড়তি দামে চাল কিনে খেতে হচ্ছে। এখন চাল নিয়ে করপোরেট গ্রুপ, শিল্প গ্রুপ, অটোমেটিক রাইস মিলের মালিকদের রমরমা ব্যবসা প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হচ্ছে। আর গলা কাটা যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তার। ধরুন, কুড়িগ্রাম জেলার কথাই ধরি। এ জেলায় হাসকিং মিল চাতালের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয়শরও বেশি। আর অটোমেটিক মিলের সংখ্যা মাত্র ১০টির মতো। আগে যেখানে ধান চাষিরা সাড়ে ছয়শ মিলে ধান বিক্রি করতে পারতেন, এখন যেখানে ধান বিক্রি করতে হয় ১০টি অটোমেটিক রাইস মিলে। ফলে এখানে সরাসরি কৃষক যেমন ধান বিক্রি করতে পারেন না, তেমনি মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে চাষিদের ধান বিক্রি করতে হয়। ফলে প্রকৃত ধানের মূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন। পক্ষান্তরে হাসকিং মিল চাতালে উৎপাদিত চাল যেমন সহজলভ্য ছিল, এখন কিন্তু অটোমেটিক মিলের চাল অত সহজলভ্য নয়। এখানে স্বল্পসংখ্যক মিল হওয়ায় চাল বিক্রির ক্ষেত্রেও এক ধরনের বাড়তি লাভের প্রবণতা কাজ করে। ফলে সিন্ডিকেট করাও সহজ হয়। এসব মিলে প্রচুর পরিমাণ ধান কিনে মজুদ করে রাখে। পরে ধীরে ধীরে চাল তৈরি করে দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তার গলা কাটে। আর বলা হয় হাসকিং মিলের চাল উন্নত নয়। ভালো মানের চালের জন্য অটোমেটিক মিলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ সরকার হাসকিং মিলগুলোকে সামান্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে একটু সমৃদ্ধ করলে অটোমেটিক মিলের একচেটিয়া আধিপত্য বিলোপ করা সম্ভব। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। তা না হলে হয়তো মজুদদারকে ধরা হবে, মনিটরিং বাড়ানো হবে, এমনি হাজারো কথা বলা যাবে সত্য, কিন্তু প্রকৃত অর্থে চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে রাখা কঠিন হবে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে গুটিকতক অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক। বাস্তবে হচ্ছেও তাই।

এখনো সময় আছে। হাসকিং মিল চাতালগুলোকে কিছুটা আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলে অটোমেটিক রাইস মিলের একচেটিয়া আধিপত্য অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তা না হলে চালের দাম ভোক্তার নাগালে কস্মিনকালেও সরকার নিয়ে আসতে পারবে না। ফলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন চাল বেশি দামে কিনে খেতে হবে। পক্ষান্তরে গুটিকতক মিল মালিক মুনাফার নামে ভোক্তার গলা কেটে একাধিক অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক বলে যাবেন। এভাবেই গুটিকতক ব্যক্তির হাতে চালের মতো অতি নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে। এমনকি দেশে চালের অভাবের অজুহাতে চাল আমদানির মূল কাজটিও এসব স্বয়ংক্রিয় মিলের মালিকরাই করছেন। যারা বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় চাল এনেও রমরমা ব্যবসার সুযোগ নিচ্ছেন।

চালের বাজারে স্বয়ংক্রিয় মিলের একচেটিয়া আধিপত্য বিলোপ করে হাসকিং মিল চাতালকে পুনর্জীবিত করতে হবে। তা হলে গোটা দেশের ৫-৬শ অটোমেটিক রাইস মিলের বদলে প্রায় ১৫-১৬ হাজার হাসকিং মিল পুনর্জীবিত হলে একদিকে যেমন কৃষকের ধানের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ আর গুটিকতক মিলারের হাতে থাকবে না। এতে করে পুষ্টিসমৃদ্ধ চালের সরবরাহ যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি চালের সিন্ডিকেট গড়ে তোলাও কঠিন হবে। অর্থাৎ চালকে নিয়ে কারসাজির পথ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে চালের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেকাংশেই কঠিন হবে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আমরা মনে করি, ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও সহনীয় মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রধান বিশেষভাবে নজর দেবেন।

 

আব্দুল হাই রঞ্জু : কলাম লেখক

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here