‘বড় ছেলে মিঠুনকে বিয়ে দিয়েছিলাম। তার বউ পাঁচ মাসের গর্ভবতী। তার কতকিছু খেতে চাই। আমাকে বলেও আমি এনে দিতে পারি না। বড় মেয়েও বাড়িতেই থাকে। তারপর ছেলে লছমি ৮ ক্লাস পড়ার পরে আর পড়াতে পারিনি টাকার অভাবে।’ কথাগুলো বলছিলেন মৌলভীবাজারে বংশপরম্পরায় চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাওয়া মালতী গঞ্জু। ১২০ টাকার বদলে শনিবার ১৪৫ টাকা মজুরি করার প্রস্তাব রাখা হয়। প্রথমে রাজিও হন চা শ্রমিক নেতারা। কিন্তু এই অর্থে কি সংসার চলে? এমন প্রশ্ন রেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চা শ্রমিকরা। এদিকে দীর্ঘ নাটকীয়তা শেষে ‘এ বেতন কাঠামো মানেন না’ সর্বাত্মকভাবে ঘোষণা দিলেন চা শ্রমিক নেতারা।
মজুরি বাড়ানোর দাবিতে টানা ১২ দিন আন্দোলন শেষে চা শ্রমিকদের মজুরি আগের চেয়ে মাত্র ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করা হয়। অর্থাৎ মালিকরা যা দিতে চেয়েছিলেন তার থেকে মাত্র ১১ টাকা বেশি।
গতকাল শনিবার বিকালে শ্রীমঙ্গলে শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকের পর শ্রমিক নেতাদের একটি অংশ ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল এ সময় ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ১৪৫ টাকা মজুরি দেওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়ে তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
কিন্তু এ মজুরি মেনে নেননি স্থানীয় চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের ঘোষণার পরও শ্রম অধিদফতরের সামনে তারা বিক্ষোভ করেন। শ্রম দফতরের ভেতরে থাকা চা শ্রমিক নেতারা সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও বাইরে থাকা নেতারা মানেননি। এরপর ওখান থেকে বিক্ষুব্ধ অবস্থায় বাইরে থাকা নেতারা বিভিন্ন বাগানে চলে যান। এদিকে ১৪৫ টাকা মজুরি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিপ্লব মান রাজী পাশী। এদিকে বিশ^বিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকেও এই ঘোষিত মজুরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। চা শ্রমিক ইউনিয়নের একটি অংশ এই মজুরি মেনে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেনে স্থানীয় চা শ্রমিকরা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ, শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ কর্মকর্তারা ও বেশ কয়েকজন চা শ্রমিক ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অবশেষে রাত ১০টার পর অনেক নাটকীয়তা শেষে শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ১৪৫ টাকা মজুরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও। চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, আমি এখনো মজুরি সংক্রান্ত এগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর করিনি। তাদের মজুরি প্রস্তাবের পর আমি শুধু মৌখিকভাবে বলেছিলাম ধর্মঘট সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করছি। কিন্তু আমাদের শ্রমিক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি যে আগামীকাল থেকে আমাদের ধর্মঘট চালিয়ে যাব।
এর আগে ‘চা-শিল্পের ১৬৮ বছরের ইতিহাসে চা-শ্রমিকদের মজুরি ১৬৮ টাকাও হলো না’- বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন চা শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজারের আহŸায়ক রাজদেও কৈরী। দেশে চা শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর নারী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল এক টাকা এক আনা আর পুরুষ শ্রমিকের ছিল এক টাকা দুই আনা। পরে বিভিন্ন সময়ে বেড়ে হয় ৮ টাকা, ১২ টাকা, ১৮ টাকা, ২০ টাকা, ২২ টাকা এবং ২৪ টাকা। ২০০৮ সালে এসে হয় ৩২ টাকা। ২০০৯-এ এসে হয় ৪৮ টাকা। আর ২০১৭ সালে হয় ১০২ টাকা। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পূর্বের চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। পরে ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই চুক্তিতে চা শ্রমিকদের মজুরি ১০২ থেকে ১২০ টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালে ১ জানুয়ারি হতে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করার কথা। কিন্তু মালিকপক্ষ তা করেনি। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে ১৯ মাস। ফলে মজুরি বৃদ্ধির চুক্তি স্বাক্ষরে চা শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানালেও মালিক পক্ষ কোনো আলোচনায় আসেনি। অবশেষে চা শ্রমিক ইউনিয়ন দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে গত ৯ আগস্ট থেকে ২ ঘণ্টা করে ৪ দিনের কর্মবিরতি শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তা ১৪৫ টাকায় নিষ্পত্তি হয়।
প্রথম চা গাছ রোপণ থেকে ধরলে বাংলাদেশে চা শিল্পের বয়স ১৭৮ বছর। সুদীর্ঘ এ সময়ে দেশের মানচিত্র বদলেছে দুবার। মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, সবকিছু হিসাব করলে এই ১৭৮ বছরে ১ টাকা করেও বাড়েনি শ্রমিকদের আয়। কিন্তু ব্যয় বেড়েছে শতভাগ।
১৮০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতবর্ষের আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় চা চাষ শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ সালে জমি বরাদ্দ হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেখানে চা চাষ বিলম্বিত হয়। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা কুণ্ডদের বাগান নামে পরিচিত। এই বাগানটিও প্রতিষ্ঠার পরপরই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর ১৮৫৪ সালে মতান্তরে ১৮৪৭ সালে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডের কাছে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত মালনীছড়াই বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশে চা বাগানের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। দেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধু দুটি জেলায় চা আবাদ করা হতো, একটি সিলেট জেলায় যা ‘সুরমা ভ্যালি’ নামে পরিচিত ছিল, আর অপরটি চট্টগ্রাম জেলায় যা ‘হালদা ভ্যালি’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। বৃহত্তর সিলেটের সুরমা ভ্যালিকে ছয়টি ভ্যালিতে ভাগ করা হয়েছে, যথাক্রমে লস্করপুর ভ্যালি, বালিশিরা ভ্যালি, মনু-দলই ভ্যালি, লংলা ভ্যালি ও নর্থ সিলেট ভ্যালি। আর হালদা ভ্যালিকে চট্টগ্রাম ভ্যালি করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে দুটি চা নিলাম কেন্দ্র (চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্র এবং শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্র) রয়েছে। এ ছাড়া ২০০২ সাল থেকে চা বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায় ক্ষুদ্রায়তনে চা আবাদ শুরু হয়।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চা বাগানে ৫ লাখের বেশি চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী শ্রমিক প্রায় ১ লাখ, সেই একজন শ্রমিকের মজুরি দিয়ে কমপক্ষে ৫ জনকে ভরণপোষণ করতে হয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে ৩০০ টাকা মজুরি পেলেও তো সেটা সম্ভব নয়। যেখানে সরকার দলীয় এমপি উপাধ্যক্ষ ড. আবদুশ শহীদ জাতীয় সংসদে চা শ্রমিকদের জন্য ৫০০ টাকা মজুরির পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন।
চা বাগানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে চা উৎপাদনে বাংলাদেশ ৯ম স্থানে উঠে এসেছে। এমনকি করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চা শ্রমিকরা উৎপাদনে সক্রিয় থাকায় ২০২১ সালে দেশে ৯৬ দশমিক ৫০৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। চা শ্রমিক ইউনিয়ন সেখানে দাবি করেছিল মাত্র ৩০০ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দাবির নিষ্পত্তি হয় ১৪৫ টাকায়।
প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিকরা দৈনিক ২৩২ রুপি (২৭৭ টাকা) পেয়েও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশ চীন ও কেনিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম।
চা বাগানের শ্রমিক চ‚ড়ামন দাস বলেন, ১২০ টাকা দিয়ে আপনি কতটুকু চাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, ডাল কিনতে পারবেন? পুষ্টিকর বা সুষম খাবার তো অনেক দূর। চা শ্রমিকরা দিনের পর দিন এক বেলা খেয়ে আর উপোস থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যারা রেশনে চাল বা আটা পায়, তারা এক বেলা খেতে পারে। অনেকে সকালে একমুঠো চাল ভাজি করে রঙ চায়ের সঙ্গে খেয়ে কাজে যায়।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল চা বাগানের শ্রমিক চ‚ড়ামন দাস একসময় নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে বলে ওঠেন, ‘রাতে কোনোমতে মাড়ভাত খাইয়ে ঘুমাই যায়। কিন্তু কামে গেলে শুধু ভুখ লাইগে যায়। এই বাবু পিঠের ঝুড়িতো এখন দেখি পেটে ঠেকছে।’
বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে পাঁচ, সাত সদস্যের চা শ্রমিক পরিবার কোনোমতেই চলতে পারছেন না বলে শ্রমিকদের অভিযোগ। শমশেরনগর চা বাগানের নারী শ্রমিক মনি গোয়ালা ও দেওছড়া চা বাগানের মায়া রবিদাস বলেন, ‘স্বামী, সন্তান, শ^শুর, ননদসহ ছয় জন ও আট জনের সংসার আমাদের। মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭৫ কেজি চাউল লাগে। ৭৫ কেজির মূল্য কমপক্ষে ৩৭৫০ টাকা। ৩ কেজি ডাল ৩৬০ টাকা, আড়াই লিটার সয়াবিন ৫০০ টাকা, আলুসহ শাকসবজি ১ হাজার টাকা, পেঁয়াজ-রসুন-মসলা-লবণ-চিনি ৭০০ টাকা, বিদ্যুৎ বিল ২৫০ টাকা, সাবান ১৫০ টাকা, পূজা, উৎসব, শ্রাদ্ধ্য ও ইউনিয়ন চাঁদা ৯০ টাকা, ফান্ড ২৫০ টাকা, মাছ-মাংস-ডিমে ২ হাজার টাকা, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ ৫০০ টাকা ও অন্যান্য ৫০০ টাকা হিসাবে মাসে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হচ্ছে। কাপড় চোপড়ের হিসাব তো বাদই থাকল। সর্বনিম্ন এ হিসাবেই দৈনিক খরচ আসে প্রায় সাড়ে ৩০০ টাকা।’
তারা আরও বলেন, চা বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মজুরি হিসাবে মাসে ৩৬০০ টাকা পাই। আর সপ্তাহে সাড়ে ৩ কেজি হারে গম দিলেও ওজনে ৩ কেজিই হয়। মাসে ১২ কেজি। তবে ১২ বছরের নিচে সন্তান থাকলে গমের পরিমাণ কিছুটা বেশি পাওয়া যায়। চিকিৎসা হিসেবে বাগানের পক্ষ থেকে যেটুকু পাওয়া যায় তা অতি নিতান্তই। জটিল সমস্যায় বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করালে ২০ হাজার টাকা বিল এলে বাগান ম্যানেজার দেন মাত্র ৫ হাজার টাকা। বাকিগুলো নিজেদেরই ভর্তুকি দিতে হয়। এভাবে চা শ্রমিক পরিবারের দুঃখ-কষ্টের সংসার চললেও ভেতরের খবর বাইরের কেউ জানেন না। ৩৬০০ টাকার বাইরে সংসারের বাড়তি খরচ জোগাতে বেকার সদস্যরা বাইরে টুকিটাকি কাজ করেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চলতে হয় বলে জানান তারা।
চা শ্রমিক বিশেষজ্ঞ ও চা শ্রমিক সন্তান প্রফেসর চিত্তরঞ্জন রাজবংশী বলেন, অস্থায়ী থেকে চা বাগানে স্থায়ী শ্রমিক হওয়াও আরেক যুদ্ধ। শ্রম আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে স্থায়ী করার নিয়ম রয়েছে। তবে ৬-৭ বছর কাজ করেও স্থায়ী হতে পারেননি, এমন অসংখ্য শ্রমিক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন চা শ্রমিকরা। তারা বলেন, স্থায়ী শ্রমিকের পিএফ (প্রভিডেন্ট ফান্ড) কাটা হয়। অবসরের পর তিনি কিছু টাকা পান, যা শেষজীবনে কাজে আসে। যত দেরিতে স্থায়ী শ্রমিক করা হবে, তাতে কম টাকা দিতে হবে বলে স্থায়ী করতে টালবাহানা করা হয়।







