Home জাতীয় খরচ কমিয়ে বাঁচার কৌশল

খরচ কমিয়ে বাঁচার কৌশল

0
44

বগুড়ার কাহালু থানার বাসিন্দা আবু বকর। গ্রামে তার একটি সমিল ও একটি মুদি দোকান রয়েছে। আয়-রোজগার খারাপ না, মধ্যবিত্ত এক পরিবারের কর্তা তিনি। শ্বশুর লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ায় চিকিৎসার জন্য সপ্তাহখানেক হলো এসেছেন ঢাকায়। চিকিৎসক বলেছেন, মাসখানেক ঢাকায় থেকে চিকিৎসা করতে হবে। তাই এক মাসের জন্য উঠেছেন রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি মেসে। একজন সচ্ছল পরিবারের কর্তাব্যক্তি হয়েও তিনি ঢাকায় এসে রিকশা চালাচ্ছেন। শ্বশুরের চিকিৎসা করাতে এসে রিকশা চালাচ্ছেন কেন? জানতে চাইলে প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন বলতে। পরে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে বলতে থাকেন কষ্টের কথা।

আবু বকর বলেন, ‘আমার বেশ বড় পরিবার। তবু ব্যবসা-বাণিজ্য করে সংসার চলে যেত। কিন্তু খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম, সন্তানের লেখাপড়া খরচসহ সংসারের ব্যয় এখন এত বেড়েছে, রোজগারে আর কুলায় না। আমার শ্বশুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ঢাকায় এনেছি চিকিৎসা করাতে। বিভিন্ন রকম টেস্ট করে চিকিৎসক জানান, তার লিভার সিরোসিস হয়েছে, মাসখানেক ঢাকায় থেকে চিকিৎসা করাতে হবে, যা টাকা এনেছিলাম টেস্ট করাতেই তার প্রায় অর্ধেক ফুরিয়ে গেছে। কল্যাণপুরে যে মেসে উঠেছি সেখানেও থাকা-খাওয়া বাবদ দুজনের খরচ হবে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বাড়ি থেকে যে আরও টাকা পাঠাতে বলব সে উপায়ও নেই। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম, যে কদিন ঢাকায় থাকি যদি কোনো কাজ করা যায় তা হলে অন্তত থাকা-খাওয়ার খরচটা তো উঠবে। বসে থাকলে তো চিকিৎসার টাকাগুলো ফুরিয়ে যাবে, তখন শ্বশুরের চিকিৎসা করাতে পারব না। শেষমেশ ঠিক করলাম, রিকশা চালাব। যেদিন ঢাকায় এসেছি, তার এক দিন পর থেকেই কল্যাণপুর ও মিরপুর এলাকায় রিকশা চালাচ্ছি। তবে এর আগে কখনও রিকশা চালাইনি তো, তাই কষ্ট হয়।

এ ছাড়া কিছুটা শরমও লাগে। এ জন্য অনেক সময় গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রিকশা চালাই, যদি পরিচিত কেউ দেখে ফেলে। কিন্তু দেখলেও কিছু করার নেই। এ কঠিন সময়ে বেঁচে থাকতে হলে পেটে ক্ষুধা রেখে লজ্জা করলে তো আর চলবে না। এভাবে বিকল্প উপায়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হবে।’

শুধু একজন আবু বকর নন, তার মতো মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজারো কর্তাব্যক্তিকে এখন এই কঠিন সময়ে বেঁচে থাকার জন্য ভিন্নভাবে লড়াই করতে হচ্ছে। তবে একেক জনের লড়াইয়ের গল্প একেক রকম।

যেমন রাজধানীর পীরেরবাগ এলাকার ষাটোর্ধ্ব হাফিজুর রহমান। মাত্র পাঁচ টাকা বাঁচাতে যে স্টপেজে নামার কথা তার দুই স্টপেজ আগেই নেমে যান তিনি। চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, অফিস কারওয়ান বাজারে। এখান থেকে তিনি প্রতিদিন হেঁটে যান খামারবাড়ী মোড়ে। সেখান থেকে লেগুনায় যান ষাটফুট এলাকায়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১০ আগস্ট থেকে এ রুটের সব লেগুনায় ৫-১০ টাকা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তিনি খামারবাড়ী থেকে উঠে নামেন আমতলা বাজারে। এখানে আগে ভাড়া রাখা হতো ২০ টাকা, এখন নেয় ২৫ টাকা। লেগুনাগুলো মূলত গ্যাসচালিত, তাই ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে লেগুনার ভাড়া বাড়ানো মেনে নিতে পারছেন না

এ রুটে যাতায়াত করা হাফিজুর রহমানের মতো সব যাত্রীই। কিন্তু লেগুনার মালিক-চালকদের কাছে জিম্মি যাত্রীরা। এখন প্রতিদিনই বাকবিতণ্ডা হচ্ছে ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। গত রোববার এ প্রতিবেদকসহ লেগুনায় যাওয়ার পথে লেগুনার হেলপারের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্কে জড়ান হাফিজুর রহমান। তিনি বাড়তি ভাড়া দেবেন না, হেলপারও ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি ৫ টাকা বাঁচাতে দুই স্টপেজ আগে নেমে যান এবং বাকি পথটুকু হেঁটে চলে যান।

এ প্রতিবেদকও তার সঙ্গে কথা বলার জন্য নেমে পড়েন এবং কুশল বিনিময় শেষে জানতে চাওয়া- কী করেন আপনি। প্রথমে একটু বিরক্তভাব দেখালেও তিনি বলেন, ‘আরে বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৩৫ হাজার টাকার বেতনে চাকরি করি। এতেই চলে আমার ছয়জনের সংসার। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। শুধু তাই নয়, ঘর থেকে পা ফেললে যেখানে যাবেন, যা কিনবেন, যা খাবেন- তার সব খরচই বেড়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ। আমার বেতন কিন্তু বাড়েনি এক টাকাও। তাই বেতনের টাকায় এখন মাসের অর্ধেকও চলে না। খাওয়া কমিয়েছি, মাছ-মাংস খাওয়া তো এক রকম ছেড়েই দিয়েছি। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে এখন প্রতি মাসে আমাকে ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে।

এ ছাড়া ধারই বা কত নেওয়া যায়? কার কাছে নেওয়া যায়। ধার নেওয়ার জায়গাগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ ধার নিয় অনেককেই শোধ দিতে পারছি না। কোন মুখে আবার ধার চাই তাদের কাছে। সুতরাং কোনো রকম খেয়ে-না খেয়ে কষ্টে দিন পার করছি এখন আমরা। তাই এখন একটি টাকা খরচ করতে গেলেও তিনবার ভাবতে হচ্ছে। লেগুনা চালকরা অন্যায়ভাবে ৫ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে। এ ৫ টাকাও এখন আমার কাছে অনেক গুরুত্বপর্ণ। তাই লেগুনার হেলপারের সঙ্গে ঝগড়া না করে দুই স্টপেজ আগে নেমে বাকি পথ আমি হেঁটে যাচ্ছি এখন। কারণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তো এখন অসহায়। সবাই চুষে খাচ্ছে আমাদের। সাধারণ মানুষের কথা ভাবছে না কেউ। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য নিজেকেই কাটছাঁট করে চলতে হচ্ছে, কষ্ট করে চলতে হচ্ছে।

দুই বেলা কলা-পাউরুটিতে দিন কাটে রিকশাচালক আইনাল ইসলামের। রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় রিকশা চালান তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে আসতে সাধারণত ২০ টাকা ভাড়া নেন রিকশাচালকরা। গন্তব্যে পৌঁছে ২০ টাকা দিতেই একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘মামা ২০ টাকা দিয়েন না, ৩০ টাকা দেন।’ কেন ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা দেব, আপনার রিকশাও কি তেলে চলে নাকি? ‘না মামা, সব কিছুর দাম বাড়ছে, রিকশার জমা বাড়ছে, থাকার ভাড়া বাড়ছে, খাওয়ার খরচ বাড়ছে- বেশি না দিলে কীভাবে বাঁচুম।’

তারপর এ সঙ্কটকালে তার জীবন-সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন আইনাল ইসলাম। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। গত ১০ বছর ধরে রিকশা চালান ঢাকায়। তিন সন্তানের জনক তিনি। স্ত্রী-বৃদ্ধ মাসহ ৬ জনের সংসার তার। পরিবারের সদস্যরা গ্রামেই থাকে। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পাঠাতে হয় গ্রামে। তিন সন্তানই লেখাপড়া করছে। এ ১০ বছরের ঢাকার জীবনে এতটা সঙ্কটে তিনি কখনও পড়েননি।

আইনাল বলেন, ‘আগে রিকশার জমা ছিল ১১০ টাকা, এখন হয়েছে ১৩০ টাকা, যে গেরেজে রাতে ঘুমাই সেখানকার ভাড়া ছিল ১৩০ টাকা, এখন ১৫০ টাকা, গেরেজেই দুপুরে ও রাতে ১০০ টাকায় খেতাম, এখন আরও ৩০ টাকা দিতে হয়। আমার প্রতিদিনের ব্যয় বেড়েছে ৯০ টাকা। দিনে আয় করি ৫০০-৬০০ টাকা। রিকশার জমা ও বাড়তি ব্যয়েই চলে যায় ২০০ টাকা। বাকি টাকা বাড়ি পাঠানোর জন্য রেখে দিই। এ অবস্থায় ভেবে দেখলাম কীভাবে খরচ কমানো যায়। শেষ পর্যন্ত গেরেজে দুই বেলার জায়গায় শুধু দুপুরে খাবার খাই। সকালে আর রাতে কলা-পাউরুটি খেয়ে থাকি। কিন্তু কলা-পাউরুটিও খাওয়ার মতো পরিস্থিতি আর নেই। একটা কলা আগে ছিল ৬-৭ টাকা, এখন হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। একটি পাউরুটি ছিল ৮ থেকে ১০ টাকা এখন হয়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। চায়ের দামও বাড়িয়েছে ৩ টাকা। এ জন্য চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। দুই বেলা কলা-পাউরুটি আর এক বেলা ভাত খেয়ে খরচ কমিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’

রাজধানীর মিরপুরের মধ্যপাইকপাড়ার সবজি ব্যবসায়ী ফজলুর রহমানের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্পটা আরও করুণ। গত ১২ বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করেন তিনি। টিনশেডের দুই রুমে তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে থাকতেন। মহল্লার একটি বাজারে সবজি বেচতেন। সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি তার আয়ে আর কুলাতে পারছেন না।

তিনি বলেন, ‘দুই হাজার টাকা দোকান ভাড়া বাঁচাতে এখন ভ্যানে সবজি বিক্রি করেন। এতে মাসে আয় হয় ১৬ হাজার টাকার মতো। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসে তার খাবার খরচই লাগে ১০ হাজার টাকা। বাকি ৬ হাজার টাকায় ঘরভাড়া হয় না। তাই চলতি মাসের ১ তারিখে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। বড় মেয়ে ও ছেলে এখানে স্কুলে পড়ত। তারা ঢাকা ছেড়ে যেতে চাচ্ছিল না, লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে। অনেক কান্নাকাটি করছিল। বাবা হিসেবে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কী করব, এ আয় দিয়ে তো আমি কুলাতে পারছি না। তাই স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে আমি একটি মেসে উঠেছি।’

মধ্যবিত্তরা গরিব হয়ে যাচ্ছে : অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, বিগত কয়েক যুগের মধ্যে দেশের মানুষ এতটা সঙ্কটে কখনও পড়েনি। কারণ এখন যেভাবে সব দিক দিয়ে সঙ্কট ঘিরে ধরেছে, সে রকমটা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিকেও কখনও মোকাবিলা করতে হয়নি দেশের মানুষকে। এখন শুধু ধনী পরিবারগুলো বাদে দেশের আর কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ ভালো নেই। কেন ভালো নেই, চোখ বুজে একবার ভাবলেই চোখের সামনে কারণগুলো স্পষ্ট আকারে ভেসে উঠবে।

করোনার ধাক্কায় আয় কমে দেশে নতুন দরিদ্র হয়েছে ৩ কোটির বেশি মানুষ। এর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, এ যুদ্ধের অজুহাতকে পুঁজি করে দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীদের অন্যায্য ও বেপরোয়া মুনাফার লোভের কারণে এখন দেশের মধ্যবিত্ত পরিব-ারগুলো ক্রমেই গরিব হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরা এখন গুমরে কাঁদছে। তবে সরকার আগে থেকে কিছু পদক্ষেপ নিলে এবং দুর্নীতি কমালে দেশের মানুষকে এতটা দুর্দশায় পড়তে হতো না।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here