প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস ফার্মের ডিমের দাম এখন স্বল্পআয়ের ক্রেতার নাগালের বাইরে। হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে ডিম। কিছুদিন আগেও ১১৫ থেকে ১২০ টাকা ডজনে বিক্রি হওয়া ফার্মের ডিমের দাম এক লাফে ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খামারিরা বলছেন, খামার পর্যায়ে কম বাড়লেও বাজারে ডিমের দাম বেড়েছে অনেক বেশি। হাতবদলে মধ্যস্বত্বভোগীরাই দাম অতিরিক্ত বাড়াচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তা আরও উসকে দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, পাকা রশিদ ছাড়াই চলছে ডিমের বেচাকেনা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাজার ও চাহিদা বুঝে পাইকারি ও ব্যবসায়ী সমিতিগুলো ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফোনে নির্ধারণ করে দেওয়া দাম অনুযায়ী বিক্রি হয় ডিম। এতে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ডিমের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
advertisement
একাধিক খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খামারে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ কমবেশি ৮ টাকা। সেই ডিম খামারিরা ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা দরে বিক্রি করেন। স্থানীয় পাইকাররা এর বেশি দাম দেন না। স্থানীয় পাইকার ও ব্যবসায়ী সমিতিগুলোও একাট্টা হয়ে ক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে। খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে এ ডিম অন্তত তিন হাতবদল হয়। হাতবদলে কী দামে ডিম বিক্রি হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় ব্যবসায়ী সমিতি।
এমন অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার ডিম ও মুরগির পাইকারি ও খুচরা দোকানে তদারকিমূলক অভিযান চালানো হয়। ঢাকা জেলা কার্যালয়ের অফিসপ্রধান মো. আবদুল জব্বার ম-ল ও প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাসানুজ্জামানের পরিচালিত এ অভিযানে দেখা যায়, ডিমের আড়তে ডিম ক্রয়ের পাকা ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ করা হয় না। ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ করলেও ক্যাশ মেমোতে মূল্যের ঘর সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে। অর্থাৎ ক্রয়মূল্য বুঝতে পারা যায় না। কোনো দোকানে ডিমের মূল্য তালিকা টানানো নেই। এভাবেই চলছে ডিম বেচাকেনা।
মো. আবদুল জব্বার মণ্ডল আমাদের সময়কে বলেন, ডিমের বাজারে অভিযান চালিয়ে আমরা হতবাক। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই। কোন পর্যায়ে ডিমের ক্রয়মূল্য কত- তা কেউ জানেনই না। রশিদ থাকলেও মূল্যের জায়গায় ফাঁকা। আরও অবাক হতে হয়েছে এই শুনে যে, ডিমের দাম ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নেতা কর্তৃক নির্ধারিত হয়। ক্রয়মূল্য কত সেটার ওপর ভিত্তি করে নয়, সমিতি থেকে যে দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয় সে দামেই ডিম বেচাকেনা চলছে।
খোদ ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির কাছ থেকেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী সমিতির নেতারাই বলছেন ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে নয় বরং চাহিদা অনুযায়ী ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কত দামে ডিম কেনা হয়েছে তা মুখ্য নয়, চাহিদা বাড়লে নাকি তারা দাম বাড়িয়ে দেন। এভাবেই চলছে। এই অনিয়ম ঠেকাতে আমাদের অভিযান শুরু হয়েছে। আগামীতেও চলবে।
এদিনের অভিযানে ডিম বিক্রিতে অনিয়মের দায়ে হিমালয় ট্রেডার্স ডিমের আড়ত ও জনতা মা মনি ডিমের আড়তকে আলাদা ২০ হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেই সঙ্গে বাজারের সততা মুরগির আড়তকে ২০ হাজার টাকা ও আলহাজ এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় বলে জানান জব্বার ম-ল। এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ বাজারের পাইকারি বিক্রেতারা কোনো মন্তব্য করেননি।
স্থানীয় পাইকার ও ব্যবসায়ী সমিতিগুলো সিন্ডিকেট করে ডিমের দাম বেঁধে দেওয়ায় খামারিরা দাম পাচ্ছেন না বলে জানান গাজীপুরের খামারি মো. হাসিব মোল্লা। তিনি বলেন, খামারে ডিমের দাম বাড়লে বাজারেও সমানুপাতিক হারে বাড়ার কথা। অথচ বাজারে বাড়ছে বেশি হারে। ডিম কত দামে কেনা হবে, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে স্থানীয় পাইকাররা। খামারিরা ১০০ পিস ডিমে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা দাম পাচ্ছেন। অথচ সেই ডিম খুচরায় বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকা পর্যন্ত। মৌসুমভেদে খামারিদের লাভ-লোকসান হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কখনোই লোকসান হয় না। বরং সুযোগ বুঝে তারা অতিরিক্ত লাভ করেন। এভাবে খামারিদের ঠকানো হচ্ছে।
এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী আমাদের সময়কে বলেন, স্থানীয় পাইকার ও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির বিশেষ কৌশলে বলি হচ্ছেন খামারিরা। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা ঠকছেন। একদিকে খামারিরা ডিমের দাম কম পাচ্ছেন, অপরদিকে বেশি দামে ডিম কিনে ভোক্তারাও ঠকছে। এর মধ্য দিয়ে বড় অঙ্কের মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন পর্যায়ে খামারিদের প্রতি পিস ডিমে বর্তমানে ৮ থেকে সাড়ে ৮ টাকা খরচ হয়। বিক্রি করতে গেলে আড়তদারদের কাছ থেকে ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৯ টাকা পিস দাম পাওয়া যায়। অথচ খুচরাবাজারে এই ডিম ১২ থেকে ১৩ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে। এ থেকেই বোঝা যায় কী পরিমাণ মুনাফা করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। ডিমের দাম কত হবে তা নিয়ে কোনো নিয়মনীতি নেই। মিডেলম্যানরা যেটা ঠিক করেন সে অনুযায়ী চলে। এভাবেই চলে আসছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সদস্য নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, কেবল ডিমের বেলাতেই নয়। ব্রয়লার মুরগির বেলাতেও এমনটা চলছে। খামারে মুরগি বিক্রি করার বেলায় দাম কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ, বাজারে বিক্রি হচ্ছে অতিরিক্ত দামে। একটি চক্র দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কেনা দাম কত, সে অনুযায়ী নয়, বরং তাদের ইচ্ছেমাফিক নির্ধারিত দামে মুরগি ও ডিম বিক্রি হচ্ছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে দাম বেশি বাড়ানো হচ্ছে।
রাজধানীর কদমতলী এলাকার সাদ্দাম মার্কেট বাজারের ডিম বিক্রেতা মো. মিলন বলেন, গত মাস থেকেই ডিমের দাম বাড়তি। তারপরও গত মাসে পাইকারিতে ১০০ পিস ডিম ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকাতেও কিনতে পেরেছি। সে ডিম এখন ১ হাজার ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। যদিও বৃহস্পতিবার পাইকারিতে দাম কমেছে। এখন ডিমের শ’ কেনা পড়ছে ১০৫০ টাকা। বিক্রি কমে যাওয়ায় এখন দাম কমতে শুরু করেছে। এখন ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪৬-১৪৮ টাকা। শিগগিরই দাম আরও কমবে বলে আশা করছি।










