মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে হলে দক্ষতা, তথ্য, স্বচ্ছতা ও নিরাপদ অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে
মোঃ লিটন আহমেদ
চেয়ারম্যান, Bangladesh Global Diaspora Council
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে মূলত সংখ্যাকেন্দ্রিক। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যান এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু শ্রমিকের সংখ্যা নয়—দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, ভাষাজ্ঞান, পেশাগত যোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শুধু বেশি কর্মী পাঠানো নয়, আরও দক্ষ কর্মীকে আরও ভালো চাকরিতে পাঠানোই হতে হবে আগামী দিনের লক্ষ্য।
এ জন্য বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাজার বৈচিত্র্যও জরুরি
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার এবং ভবিষ্যতেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। নির্মাণ, পরিবহন, হসপিটালিটি, পরিষেবা ও বিভিন্ন কারিগরি পেশায় বাংলাদেশি কর্মীদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে একটি বা কয়েকটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, স্থানীয়করণ নীতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা অভিবাসন নীতির পরিবর্তন হঠাৎ করেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে।
তাই শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য এখন শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্মাণ, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, লজিস্টিকস, কেয়ার সার্ভিস, হসপিটালিটি এবং দক্ষ কারিগরি পেশায় কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তবে এসব বাজারে সফল হতে হলে প্রচলিত কর্মী পাঠানোর মডেল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দেশভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক প্রস্তুতি।
‘Job Demand First’ নীতি চালু করা প্রয়োজন
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে “Job Demand First” নীতি।
অর্থাৎ প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে—কোন দেশে কোন পেশায় কতজন কর্মীর প্রয়োজন, কী ধরনের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান দরকার, কী সার্টিফিকেশন প্রয়োজন এবং নিয়োগকর্তারা কী ধরনের বেতন ও সুবিধা দিচ্ছেন।
এরপর সেই বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
এতে প্রশিক্ষণ ও চাকরির মধ্যে অসামঞ্জস্য কমবে। পাশাপাশি বিদেশে গিয়ে কর্মহীন থাকা, চাকরির ধরন বদলে যাওয়া কিংবা দক্ষতার সঙ্গে কাজের অমিল হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
ইউরোপের জন্য আলাদা কৌশল দরকার
ইউরোপকে একটি একক শ্রমবাজার হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রতিটি দেশের অভিবাসন নীতি, ভাষা, বেতন কাঠামো, পেশাগত যোগ্যতা, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া আলাদা।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি Country-specific Labour Market Strategy।
কোন দেশে ওয়েল্ডারের চাহিদা বেশি, কোথায় কেয়ারগিভারের প্রয়োজন, কোন দেশে নির্মাণকর্মীর সুযোগ রয়েছে, কোথায় ড্রাইভারের জন্য বিশেষ লাইসেন্স দরকার, আর কোন পেশায় আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
এ জন্য একটি National Labour Market Intelligence System গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে সরকারি সংস্থা, দূতাবাস, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের তথ্য সমন্বিত থাকবে।
প্রশিক্ষণের ধরন বদলাতে হবে
বিদেশে যাওয়ার আগে কয়েক সপ্তাহের সাধারণ ওরিয়েন্টেশন দিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়।
প্রশিক্ষণ হতে হবে সরাসরি কর্মসংস্থানভিত্তিক। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা, আন্তর্জাতিক পেশাগত সার্টিফিকেশন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার, ডিজিটাল দক্ষতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান আইন ও সংস্কৃতি।
বিশেষ করে ইউরোপের নতুন বাজারগুলোর জন্য বাংলাদেশে দেশভিত্তিক ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
প্রশিক্ষণ শেষ হলেই হবে না; কর্মীর দক্ষতা যেন আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই ও স্বীকৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সরাসরি নিয়োগকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে
বিদেশি নিয়োগকর্তার সঙ্গে সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি B2B partnership বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা গেলে প্রকৃত চাকরির চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা সহজ হবে।
একই সঙ্গে একটি Verified Foreign Employer Database তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে নিয়োগকর্তার নিবন্ধন, পূর্ববর্তী নিয়োগের ইতিহাস, বেতন, আবাসন, কর্মঘণ্টা, চুক্তির শর্ত এবং কর্মীর অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগেই যেন জানতে পারেন—তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী কাজ করবেন, কত বেতন পাবেন এবং তাঁর অধিকার কী—এটি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিবাসন ব্যয়ে স্বচ্ছতা অপরিহার্য
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে একজন কর্মীর মোট খরচ কত—এটি অনেক সময় শুরুতেই পরিষ্কার থাকে না। এখান থেকেই অতিরিক্ত ফি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিটি গন্তব্য দেশের জন্য Standard Cost Disclosure চালু করা যেতে পারে।
এতে ভিসা ফি, মেডিকেল, প্রশিক্ষণ, সরকারি চার্জ, বিমানভাড়া, সার্ভিস ফি এবং অন্যান্য খরচ আলাদাভাবে উল্লেখ থাকবে।
সব ধরনের অর্থপ্রদান ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা এবং বাধ্যতামূলক রসিদ নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে স্বচ্ছতা অনেক বাড়বে।
একটি জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আধুনিক National Overseas Employment Platform।
এই প্ল্যাটফর্মে থাকতে পারে যাচাইকৃত চাকরির বিজ্ঞপ্তি, বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য, দেশভিত্তিক বেতন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, ভাষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ, অভিবাসন ব্যয় এবং আবেদন ও অনুমোদনের অবস্থা।
একজন কর্মী যেন নিজের মোবাইল ফোন থেকেই একটি চাকরি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
এতে প্রতারণা কমবে, তথ্যের বৈষম্য দূর হবে এবং বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীরা আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা হতে পারেন বড় সম্পদ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নন। তাঁরা স্থানীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার, ব্যবসা, নিয়োগব্যবস্থা এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও সংযোগ রাখেন।
তাই একটি Global Diaspora Workforce Network গড়ে তোলা যেতে পারে।
প্রবাসী পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং কমিউনিটি নেতাদের যুক্ত করে নতুন চাকরির সুযোগ চিহ্নিত করা, বিদেশি নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি, প্রশিক্ষণ অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বৈশ্বিক বাংলাদেশি প্রবাসী নেটওয়ার্কের মধ্যে একটি কার্যকর সেতু তৈরি করবে।
বিদেশে যাওয়ার পরও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে
নিরাপদ অভিবাসন শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। একজন কর্মী বিদেশে যাওয়ার পর তাঁর চাকরি, বেতন, চুক্তি, বাসস্থান, কর্মপরিবেশ ও অধিকারও সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর Worker Support Desk চালু করা যেতে পারে।
কর্মীরা যেন চুক্তি লঙ্ঘন, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন, পাসপোর্ট আটকে রাখা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রাথমিক সহায়তা পান—এ ধরনের ব্যবস্থা নিরাপদ অভিবাসনের অপরিহার্য অংশ।
পাঁচ বছরের পরিকল্পনাই হতে পারে পরিবর্তনের ভিত্তি
এ ধরনের পরিবর্তন এক বছরে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা।
প্রথম বছর: অগ্রাধিকার শ্রমবাজার চিহ্নিত করা, Skill Gap Database তৈরি, বিদেশি নিয়োগকর্তা যাচাই এবং জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাইলট চালু করা।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর: দেশভিত্তিক ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন চালু এবং সরাসরি নিয়োগকর্তার সঙ্গে B2B অংশীদারত্ব বাড়ানো।
চতুর্থ ও পঞ্চম বছর: Talent Mobility Programme, আন্তর্জাতিক দক্ষতা স্বীকৃতি, Workforce Centre এবং বিদেশফেরত কর্মীদের পুনঃদক্ষতা, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা।
সাফল্যের মাপকাঠিও বদলাতে হবে
শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন—এই সংখ্যা দিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্য বিচার করার সময় শেষ হয়ে এসেছে।
আমাদের জানতে হবে—কতজন দক্ষ কর্মী গেলেন, তাঁদের গড় আয় কত, বিদেশ যেতে কত খরচ হয়েছে, কতজন সরাসরি নিয়োগ পেয়েছেন, কতজন আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জন করেছেন এবং তাঁদের কর্মপরিবেশ কতটা নিরাপদ।
এই সূচকগুলো নিয়মিত প্রকাশ করা হলে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যনির্ভর হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাও বাড়বে।
সামনে যে সুযোগ
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। কিন্তু জনসংখ্যার আকার তখনই প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, যখন মানবসম্পদকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ, উৎপাদনশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও অন্যান্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। তবে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মীদের আয়, দক্ষতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শ্রমশক্তি তৈরি করা, যাদের দক্ষতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, নিয়োগকর্তারা যাদের মূল্য দেন এবং যারা বিদেশে গিয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পান।
ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কে কতজন কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারে, তা নিয়ে হবে না। প্রতিযোগিতা হবে—কে কত দক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও উৎপাদনশীল কর্মী তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সময়—
“More Workers” নয়—“Better Workers, Better Jobs, Better Income and Safer Migration.”
মোঃ লিটন আহমেদ
চেয়ারম্যান, Bangladesh Global Diaspora Council





