শ্রমিক সংকটে সার্বিয়া, বাড়ছে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার কর্মী নিয়োগ
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ডেস্ক | দ্য এনআরবি টাইমস
ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ায় স্থানীয় কর্মীর ঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। নির্মাণ, উৎপাদন, হসপিটালিটি, কৃষি, লজিস্টিকস ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়োগ করছে সার্বিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো। সার্বিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমও দেশটির কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশিসহ এশীয় শ্রমিকদের উপস্থিতি বাড়ার কথা জানিয়েছে। Vreme
সার্বিয়ার শ্রমবাজারে একদিকে বেকারত্ব থাকলেও অন্যদিকে নির্দিষ্ট পেশায় প্রয়োজনীয় কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জুনে জানিয়েছিল, বিভিন্ন পেশায় ৭৩ হাজারের বেশি শূন্যপদ ছিল। অনেক স্থানীয় কর্মী পশ্চিম ইউরোপে কাজের জন্য চলে যাওয়ায় নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে শ্রমিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। Government of Serbia
সার্বিয়ার পরিসংখ্যান দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২6 সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটিতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার এবং বেকারত্বের হার ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে আগের বছরের তুলনায় কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ৪৫ হাজার ৮০০। এসব পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নিয়োগদাতারা নির্দিষ্ট দক্ষতার শ্রমিক না পাওয়ার সমস্যার কথা বলে আসছেন। Stat Publications
বিদেশি কর্মী নিয়োগ সহজ করেছে সার্বিয়া
শ্রমিক ঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশিদের কাজ ও বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও সহজ করেছে সার্বিয়া। দেশটির সরকার জানিয়েছিল, Foreigners Portal চালুর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪১ হাজার ৩১৯টি অস্থায়ী বসবাস ও কাজের ‘Single Permit’ আবেদন অনুমোদিত হয়েছিল। Government of Serbia
বর্তমান ব্যবস্থায় কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিককে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য একক বসবাস ও কাজের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। সম্পূর্ণ আবেদন জমা পড়লে Single Permit-এর সিদ্ধান্ত সাধারণভাবে ১৫ দিনের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে চাকরির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ভিসা ও বৈধ কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অনুমোদন নিতে হয়। Welcome to Serbia
সার্বিয়ার আইনে বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বিদেশি কর্মীদের শ্রম ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মীদের মতো অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার নীতি রয়েছে। নিয়োগকর্তা বৈধ অবস্থান ও প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি কর্মীকে কাজে নিয়োগ করতে পারেন না। Welcome to Serbia
বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনাময় নতুন বাজার
বাংলাদেশও প্রচলিত মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের বাইরে ইউরোপে নতুন শ্রমবাজার তৈরির চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া ও পর্তুগালসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। The Daily Star
বাংলাদেশিদের ইউরোপমুখী বৈধ কর্মসংস্থানও বাড়ছে। বিএমইটির তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে চাকরির জন্য গেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। The Business Standard
তবে সার্বিয়ার ক্ষেত্রে এখনো প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে একদল ভিসাধারী বাংলাদেশি সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া ও মলদোভার জন্য বিএমইটির জনশক্তি ছাড়পত্র পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বৈধ ভিসা ও চাকরির ব্যবস্থা থাকার পরও ছাড়পত্রসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। The Business Standard
যেসব খাতে চাহিদা বেশি
সার্বিয়ার নিয়োগবাজারে বর্তমানে নির্মাণকর্মী, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, কারখানা কর্মী, মেশিন অপারেটর, হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মী, কৃষিশ্রমিক, ড্রাইভার, লজিস্টিকস কর্মী এবং বিভিন্ন ধরনের দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীর চাহিদার কথা নিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো জানাচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশের কর্মীদের এসব খাতে নিয়োগের জন্য সার্বিয়ান নিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক রিক্রুটাররা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। Jobs Serbia
তবে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্বিয়ায় কাজের অধিকার পাওয়া নয়। বৈধ নিয়োগকর্তা, কর্মসংস্থান চুক্তি, প্রয়োজনীয় ভিসা এবং সার্বিয়ার বসবাস ও কাজের অনুমতি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র সম্পন্ন করতে হয়। National Employment Service
শ্রমিক সুরক্ষাও বড় চ্যালেঞ্জ
সার্বিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন সার্বিয়ার একটি চীনা মালিকানাধীন টায়ার কারখানায় কর্মরত ৪০-এর বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট আটকে রাখা, কম মজুরি ও চলাচলে বিধিনিষেধসহ শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হলেও সে সময় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি; প্রতিষ্ঠানটিও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। RadioFreeEurope/RadioLiberty
ফলে সার্বিয়াকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় নতুন শ্রমবাজার হিসেবে দেখা গেলেও সরকারি যাচাই ছাড়া কোনো নিয়োগ প্রস্তাবে অর্থ প্রদান না করা, লিখিত চাকরির চুক্তি যাচাই করা এবং বেতন, কাজের সময়, আবাসন, স্বাস্থ্যবীমা ও ওভারটাইমের শর্ত পরিষ্কারভাবে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও সার্বিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে সার্বিয়া বাংলাদেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের জন্য ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজারে পরিণত হতে পারে।





