বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও কমাল সংস্থাটি, বাড়াল মূল্যস্ফীতির আভাস
অর্থনীতি ডেস্ক | দ্য এনআরবি টাইমস
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফ। মঙ্গলবার প্রকাশিত সংস্থাটির অক্টোবরের World Economic Outlook (WEO) প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা উপলক্ষে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাসটি প্রকাশ করা হয়। আইএমএফ বছরে দুবার—এপ্রিল ও অক্টোবরে—পূর্ণাঙ্গ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রকাশ করে।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আবারও কমল
আইএমএফ গত এপ্রিলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। সর্বশেষ অক্টোবরে আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। অর্থাৎ এপ্রিলের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির আভাস কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি চলে যাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৮–৮৯ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০১৯–২০ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬% থেকে ১০.৯%
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে আইএমএফ। গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল সংস্থাটি। এখন সেটি বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবির চেয়েও কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অন্যান্য বড় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আরও সতর্ক। চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। The Business Standard
আইএমএফের ৩ দশমিক ২ শতাংশের পূর্বাভাস তাই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিতে কী চাপ তৈরি হতে পারে
কম প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি একই সময়ে চলতে থাকলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসার উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার কথা তুলে ধরেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফও দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং মূল্যস্ফীতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি দ্রুততর করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আইএমএফের সংখ্যাগুলো পূর্বাভাস, চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ফলাফল নয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত সিদ্ধান্ত, জ্বালানির দাম, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির হার ভিন্ন হতে পারে।
ছবি: আইএমএফ/সংগৃহীত





