ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশে করোনার সংক্রামন যত বাড়ছে ততই মানুষের মধ্যে এর প্রতিকারের জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যকর্ম পরিলক্ষিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে নুতন কিছু উদ্ভাবন করে যেন ক্ষতি না বাড়ে সে দিকে লক্ষ্য রেখে এগুলি অবশ্যিই ব্যবহার করতে হবে . যে কোন নূতন আবিষ্কারের পর এর কার্যকারিতার পরীক্ষা এবং তার ক্ষতিকারক দিকটা দেখা আবশ্যক।
ইদানিং সিলেটে ও চট্টগ্রামের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবাণুমুক্তকরণ বা ডিসিনফ্রেকেটিং চেম্বার নামে যা প্রদান করা হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে এর মধ্যে দিয়ে স্বাস্থ্য কর্মীরা তাদের পিপিই পরেই চেম্বারের একদিকে ঢুকে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করে স্বয়ংক্রীয় জীবাণুনাশক স্প্রে ধারণ করে অন্যদিকে বার হয়ে গেলে তারা জীবাণু মুক্ত হবেন এবং পিপিই পরিয়েই নিশ্চিন্তে নিজ ঘরে ফিরে যেতে পারবেন। সিলেটের প্রদত্ত একটি ফটকের এর মত চেম্বারে ঢুকলেই মেশিন থেকে অনেক স্প্রে দিয়ে ৩% হাইড্রোজেন পারঅক্সআইড ছিটানো হবে। তাতে বলা হচ্ছে পিপিই তে থাকা এবং আপাদমস্তকের সমস্ত করোনা ভাইরাসই মারা পড়বে। ব্যাপারটা এখনই তলিয়ে দেখা ভীষণ জরুরী। এতে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কিনা অথবা এটা কোথায় কি ভাবে এর উপরকিতা বা তার অপকারিতার পরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রথমত করোনা ভাইরাস মানুষের নাক মুখ ও চোখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে তাই লোকারণ্য জায়গাতে মাস্ক পরা অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতলে করোনা রোগী দেখার জন্য ওয়ার্ডে বা কেবিনে ঢুকলে মাস্ক, গগলস ও গাউন পরে রোগীকে সেবা দিতে হবে. গাউন পরে রোগীর কেবিন বা ওয়ার্ড থেকে বাহির হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। গাউন খুলে দরজার পাশে রাখতে হবে। তাই কাপড়ের গাউন ব্যবহার করলে তা সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে বার বার পরিধান করা যাবে। আর কাগজের ডিসপসিবল গাউন গুলো একবারের বেশি ব্যবহার কর যাবেনা। গাউনটা কাজের শেষে সন্তপর্ণে খুলতে হবে যদি ঝাড়া দেয়া হয় তা থেকে ভাইরাস উড়তে পারে এবং নিজেকে এবং কাছের মানুষকে সংক্রামন করতে পারে . পিপিই পরে বাড়িতে কেন হাসপাতালে ও ঘুরে ফিরে সম্পূর্ণ নিষেধ।
পর্যাপ্ত পিপিই না থাকার কারণে সমস্ত বিশ্বে মানুষ তার বার বার ব্যাবহারের জন্য অনেক চিন্তা ভাবনা করছেন . নাক, মুখ , ও চোখের মধ্যদিয়ে করোনার সংক্রামণের জন্য মাস্ক গুলি অত্যন্ত জরুরী। সেটা বার বার ব্যবহারে জন্য CDC তিনটি প্রক্রিয়া উল্লেখ করেছে। তার জন্য আলট্রাভায়োলেট লাইট , হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বাষ্প আর অতি মাত্রায় গরম বাষ্প ব্যবহার করা. সাধারণত ৩% তরল হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে টেবিল চেয়ার, হাতল, বাথরুম ইত্যাদি সম্পূর্ণ ভাবে ভাইরাস মুক্ত করা যাবে। কাপড় বা কাগজের পিপিএ সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস কারণ সেইগুলির মধ্যে অনেক ছোট ছোট ছিদ্র থাকে এবং কাপড়ের উপর তা কার্যকরী হবে না। সেই জন্য কাপড়ের গাউনকে পানির ভিতর সাবান দিয়ে গরম পানিতে ধুয়ে জীবাণু মুক্ত করার কথা CDC guideline এ বলা হয়েছে। সাবান পানি শুধু ভাইরাস কে ধুয়ে সরিয়ে দেয়না সাবান ভাইরাস কে প্রথমে ধ্বংশ ও করে। মেডিকেল মাস্ক যেমন N ৯৫ মাস্কের জীবাণুনাশের জন্য ৩০% ( দশ গুন্ বেশি) হাইড্রোজেন পার অক্সাইড এর থেকে বাষ্প ছড়িয়ে একটি বন্ধ ঘরে ৪০ মিনিটের মত রাখলে সেটা আবার জীবাণু মুক্ত করা যায়। এবং সেই জন্য আমেরিকায় এর প্রক্রিয়া মাত্র শুরু হচ্ছে। সেই বাষ্প অনেক ক্ষণ সংস্পর্শে থাকলে তবে তা মাস্কের ভিতরের ছিদ্র গুলিতে ঢুকতে পারবে। তাই ৩% হাইড্রোজেন পার অক্সাইড শুধু ছিটিয়ে আপাদমস্তক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জীবাণু নাশক করার এই নুতন পদ্ধতি ব্যবহার করা শুধু স্বাস্থকর্মীদেরকে এবং তাদের সংস্পশে আসা মানুষেকে বিষণ বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া। এই মিথ্যা আশ্বাস হবে মারাত্মক ক্ষতিকর . এই পদ্ধতি যদি কার্যকর হয় তবে এর বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর কার্যকারিতা এবং এর থেকে ক্ষতিকারক দিকটি অবিশ্যি আগে দেখে নিতে হতে হবে. এই দুর্যোগে আমরা চাইবো নুতুন আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে মানুষের উন্নত সেবা প্রদান করা তবে তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন. যেমন করে বাংলাদেশে কিছু ভেন্টিলেটার , কিছু ডায়াগনস্টিক কিট ,ইত্যাদি প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষিত হচ্ছে। আমি আশা করবো এর উদ্ভাবকরা অনতি বিলম্বে এর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে সরকারের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে এই পদ্ধতিটা স্বাস্থকর্মীদের রক্ষার জন্য প্রদান করবেন। নতুবা এই অতি উৎসাহী প্রচেষ্টা হিতে বিপরীত হবে।
লেখকঃ অধ্যাপক মেডিসিনে এবংনেফ্রোলজি , টেম্পলে বিশ্ববিদ্যালয় , ফিলডফেলফিয়া , প্রফেসর এমেরিটাস , ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ USA











