সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত নাথালি শুয়ার্ড গত সপ্তাহে জানান, বাংলাদেশ সরকার সুইজারল্যান্ড সরকারের কাছে নির্দিষ্ট করে কারো সম্পর্কে সুইস ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশিদের অর্থ জমা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য চায়নি। রাষ্ট্রদূতের এমন বক্তব্যকে মিথ্যা দাবি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বিষয়টি বাংলাদেশের হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) সাংবাদিকদের বলেন, সুইজারল্যান্ড আমাদের ভালো বন্ধু রাষ্ট্র এবং উন্নয়ন অংশীদার। সুইস ব্যাংক বিষয়ে দুইপক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এই ভুল বোঝাবুঝির অবসানে নতুন মেকানিজম তৈরি করা হচ্ছে।
হাইকোর্ট ডাকলে সুইস রাষ্ট্রদূত আদালতে যেতে বাধ্য কিনা, সুইস দূতের কূটনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুইস রাষ্ট্রদূতের কূটনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা আমাদের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এই বিষয়ে সামনের সপ্তাহে বসব। ভুল বোঝাবুঝি যেটা হয়েছে তা অবসানের জন্য চেষ্টা করব। কারণ ওনার (রাষ্ট্রদূত) কাছে হয়ত সম্পূর্ণ তথ্য নাই বা আমাদের কাছেও সম্পূর্ণ তথ্য নাই। তাই দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে যদি একটা মেকানিজম তৈরি করা যায়, এখন যেটা আছে যে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইইউ (ফাইনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট) এবং ওদের যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বডি আছে তাদের মধ্যে হয়তা যোগাযোগ আছে বা সংযোগ আছে, যা সম্পর্কে সুইস রাষ্ট্রদূত হয়ত অবহিত নন। সেক্ষেত্রে এই ভুল বোঝাবুঝি আরো বাড়ছে। আমাদের সাথে বার্নের যোগাযোগ আছে, ঢাকায় তাদের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ রয়েছে এবং এই ইস্যুতে আমাদের যেসব সংস্থা আছে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের সঙ্গে বসে আমরা এমন একটা মেকানিজম করব সরকারগুলোর মধ্যে যাতে ভবিষ্যতে এমন ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে। সুইজারল্যান্ড আমাদের ভালো বন্ধু রাষ্ট্র এবং উন্নয়ন অংশীদার। তাই আমরা তাদের সাথে এমন কোনো ইমপ্রেশন সৃষ্টি করতে চাই না যেটা সত্য নয়।’
এমন ঘটনার পর তাদের প্রতিক্রিয়া কী, সম্পর্কে অবনতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কিনা, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমরা এমনটা চাই না। আমরা তাদের বলেছি যে আমাদের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের কিছু পরামর্শ আছে সেগুলো যদি সবার জন্য একসপ্টেবল হয় তাহলে আমরা নতুন মেকানিজম তৈরি করব এবং যার মাধ্যমে এমন ধরনের তথ্য যতটুকু জানা সম্ভব সেটা যাতে আমরা জানতে পারি। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে সে দেশের আইন দ্বারাও বিষয়টা নিয়ন্ত্রিত অর্থাৎ সকল তথ্য পাবলিকলি প্রকাশ করা যাবে না। এখানে এগমন্টের যে বিষয়টা আছে সেটাও ব্যাংকিং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সেটারও কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমাদের কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে।’
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন আরো বলেন, ‘সুইস কর্তৃপক্ষ বলতে আমরা যেটা বোঝাচ্ছি, একটা হল সরকার, আরেকটা হল এই বিষয়ে সেখানে সাংবিধানিক যে সংস্থাগুলো রয়েছে, যাদের অবস্থান সরকারের মধ্যে না, সরকারের বাইরে এবং যাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, এসব কারনে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমরা যদি একটা মেকানিজম তৈরি করতে পারি যেখানেও দুই সরকারের মধ্যেও পাশাপাশি একটা যোগাযোগ রক্ষা করা যায়, যাতে করে আগামীতে এমন ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা চেষ্টা করব যে বাংলাদেশ থেকে যাতে কেউ অবৈধ উপায়ে অর্থ পাঠাতে না পারে। তাদের পক্ষ থেকে মেকানিজম তৈরির বিষয়ে গত সপ্তাহে একটা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটা আমরা আলোচনা করব। এই প্রস্তাব পারস্পরিক তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত, যাতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।’
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে সুইজ ব্যাংকে রাখা হচ্ছে এবং বাংলাদেশ সরকার এই পাচার করা অর্থের তথ্য সুইজারল্যান্ড সরকারের কাছে চেয়ে পাচ্ছে না, ডিক্যাব টক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত নাথালি শুয়ার্ড এর কাছে গত সপ্তাহে বুধবার সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ সরকার সুইজারল্যান্ড সরকারের কাছে নির্দিষ্ট করে কারো সম্পর্কে তথ্য চায়নি।
সুইস দূতের এমন বক্তব্য সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘সেটা মিথ্যা কথা বলেছে।’ একই দিন হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানতে চান যে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ রাখা বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছিল কি না। হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবীকে গত রবিবারের (১৪ আগষ্ট) মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেন। গত রোববার রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী হাইকোর্টকে জানান যে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ জমাকারী বাংলাদেশিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি বলে দেশটির রাষ্ট্রদূত যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। ওইদিন হাইকোর্ট বলেন, সুইস রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ওইদিন আদালত রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবীকে তাদের তথ্য হলফনামা আকারে আদালতে আগামী রোববার (২১ আগস্ট) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন যে ওইদিন আদালত এই ইস্যুতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিবেন।










